ব্লকচেইনে ফের জাত চেনাতে চায় টাইগাররা
নভেম্বর ২০২৩। নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামে বসেছিল ব্লকচেইন অলিম্পিয়াডের ষষ্ঠ আসর। সেই আসরে অংশ নিয়েছিলো যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, চীন, হংকং, ভারত, বাংলাদেশসহ ১৯টি দেশ ও ইউরোপ অঞ্চলের প্রায় ৫০টি দল। এমন ডাকসাইটে ৬৮টি দলকে পেছনে ফেলে চ্যাম্পিয়ন হয় ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির টিম অ্যাপোক্যালিপস। সেই হিসেবে ব্লকচেইন পৃথিবীতে এখনো বাংলাদেশই সেরা।
সেই শৌর্য ধরে রাখতে আসছে সপ্তম আসরের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন সফট টাইগাররা। প্রথমবারের মতো এই আসরে যুক্ত করা হয়েছে প্রথম ব্লকচেইনে ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’। এক্ষেত্রে বাজিমাৎ করেছে বুয়েট জিআরসি। তবে ব্লকচেইনে এই আধিপত্য ধরে রাখতে পারেনি বুয়েটের দল ব্লাক। রোপ্য পদক জিতেলে দলটি। আর তাম্র জয় করেছে ইসলামি ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি’র দল ট্র্যাঞ্জেকশন ট্যাঙ্গো। ঘরের আসরে স্বর্ণজয়ী টিম ‘চেইন রিঅ্যাকশন’ তাই এ বছরের জামিলুর রেজা চৌধুরী চ্যাম্পিয়ন।
ব্লকচেইন অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশ
বিশ্বে ব্লকচেইন প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ ও প্রসারের সঙ্গে তাল মেলাতে প্রতি বছর আন্তর্জাতিকভাবে অনুষ্ঠিত হয় ব্লকচেইন অলিম্পিয়াড। হংকং ব্লকচেইন সোসাইটির উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এই আসরে ২০২০ সাল থেকে নিয়মিত অংশ নিচ্ছে বাংলাদেশ। ২০২১ সালে এই প্রতিযোগিতার আয়োজকও ছিলো বাংলাদেশ। ওই বছর থেকে পরপর দুই বছর রানার্সআপ হয়ে লাল-সবুজে’র ঝাণ্ডা উড়েছে বিশ্বময়। গত দুই বছর ধরে প্রতিযোগিতাটি হচ্ছে হল্যান্ডে। সেখানেই চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশ। সপ্তম আসরেও জাত চেনাতে গত ৭ জুন থেকে শুরু হয় বাংলাদেশ টিম বাছাই পর্ব। এই আসরে দেশের ১২০টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অংশ নেয় দুই শতাধিক দল। টিকে থাকে মাত্র ৩০টি দল। গত ৩ ও ৪ সেপ্টেম্বর অনলাইনে অনুষ্ঠিত হয় চূড়ান্ত পর্ব। এই আসরে বৈশ্বিক আসরের টিকিট পেলো ১৩টি দল। এর মধ্যে ব্লকচেইনের সেরা তিন দল ছাড়াও অনারেবল মেনশন হিসেবে আমস্ট্যারডামে নৈপুণ্য দেখানোর সুযোগ পেলো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘হ্যাশ ইউজার্ড’; ‘বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনোভেটর ৪.০’; বুয়েটের ‘মাল্টি থ্রেডিং’; ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ড্যাফোডিল টাইগার’ এবং মিশ্র ঘরনার দল ‘লরেন ইপসাম’।
একইভাবে প্রথম বারের মতো বাংলাদেশ থেকে ‘এআই’ ক্যাটাগরিতে চ্যাম্পিয়ন ‘বুয়েট জিআরসি’র পাশাপাশি ‘বুয়েট মাল্টিথ্রেডিং’ ও ‘বুয়েট ফাস্ট অ্যান্ড ফুরিয়ে’; ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিস’র টিম রকু ও ‘টিম ইনসোমেনিয়াক’ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিম ‘অফুরন্ত’ পেয়েছে আমস্ট্যারড্যাম টিকিট। প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে এই ক্যাটাগরি থেকেই একাই একশ’ হয়ে ঘরের আসরে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন বুয়েট জিআরসি’র সালমান সাঈদ।
একাই একশ’
প্রযুক্তি দুনিয়ায় তীব্র ঝাঁকুনি দিয়ে এরই মধ্যে কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে এআই। ইন্টারনেটের চেয়ে এর প্রবৃদ্ধি এখন কয়েকশ’ গুণ বেশি। শিখন-প্রযুক্তির (এড-টেক) সেই এআই ব্যবহার করে ইন্টারনেট যুগে পিছিয়ে থাকা অবস্থান থেকে এক লাফে বৈশ্বিক কাতারে যেতে স্বপ্ন দেখছেন এবারের ব্লকচেইন অলিম্পিয়াড চ্যাম্পিয়ন সালমান সাঈদ। বুয়েটের সিএসই বিভাগের শেষ বর্ষের এই শিক্ষার্থী উদ্ভাবন করেছে প্রয়োজন, বয়স ও শিক্ষণীয় উপকরণের ধরণ অনুযায়ী বহুমাত্রিক মডেলের এআই লার্নিং মডিউল। উদ্ভাবনটি নিয়ে বাংলালিংক ইনোভেটরস ৭.০ চ্যাম্পিয়ন দল অন দ্য এজ এর এই সদস্য বললেন, প্রত্যেকটা মানুষ এক জন আরেকজন থেকে আলাদা। তাই তার শিক্ষার ধরন অনেক রকমের। কিছু মানুষ বই পড়ে, কেউবা লেকচার শুনে কিংবা অনেকেই দেখে দেখে বা করতে করতে শিখতে পছন্দ করে। কিন্তু চলমান এডটেক প্রযুক্তিতে শিক্ষা দেয়ার ক্ষেত্রে পুরোটাই এখন ভিডিও কন্টেন্ট নির্ভর। অথচ এই দেখে বা শুনে শেখার পাশাপাশি পড়ে শেখার ব্যবস্থা করা হতো তাহলে তার জন্য এটা বেটার হতো। আবার কোনো লিখিত কোনো কন্টেন্ট যদি চাইলেই ভিডিও কন্টেন্টে রূপান্তর করা যেতো তাহলে যে দেখে তার জন্য বেটার হতো। তাই আমি এমন একটি প্লাটফর্ম থৈরি করছি যেনো কোনো শিক্ষার্থী এখানে এলে তাকে তার ব্যবহার অনুযায়ী বিন্যস্ত করে তার চাহিদা অনুযায়ী কন্টেন্ট ডেলিভারি দেয়া হবে। এজন্য কন্টেন্টটা হবে ডায়ানামিক। তাই প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য কন্টেন্ট ও এর প্রতিবেশ তার পছন্দ অনুযায়ী বেছে নেয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
প্রতারণামুক্ত ই-কমার্স
গ্রাহকের হাজার কোটি টাকা খুইয়ে আলোচিত ‘ই-ভ্যালি’ কিংবা ‘আলেসা মার্ট’ স্ক্যামের ক্ষত এখনো শুকায়নি। রিভিউ, রেটিং, ফিন্যান্সিয়াল ডেটা লিকেজ ইত্যাদি নানা জালিয়াতিতে সন্ত্রস্ত থাকতে হয় প্রতিনিয়ত। এই সমস্যার সমাধানে ব্লকচেইন প্রযুক্তির টেকসই সমাধান দেখালো ‘চেইন রিঅ্যাকশন’। স্মার্ট যোগাযোগ, বিকেন্দ্রীভূত পরিচয় এবং স্বয়ংক্রিয় ভাবে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা কৌশলের মাধ্যমে বাজার আধিপত্য বা একচেটিয়া কারবার বন্ধে দেশের ই-কমার্স খাতের নন-ডেলিভারি, নন-পেমেন্ট, ফেইক রিভিউ রেটিং ইস্যুকে জাদুঘরে পাঠাবে তাদের এই প্রযুক্তি।
বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী-শিক্ষানবীশদের ৫টি ‘পুঁথি’ গেঁথে উদ্ভাবনী দলটি গড়ে তুলেন ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি’র সদ্য স্নাতক ও উইন ট্রেড আইটি’র সফটওয়্যার প্রকৌশলী আবু সালেহ মো: বনি মমিন। বিশ্ব বিদ্যালয়ের এক বছরের সিনিয়র ও পাঠাও লিমিটেডের ডেটা প্রকৌশলী আহমেদ শাবাব নুর এবং ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সিএসই ছাত্রী সামরিন সিলভিয়া; ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের বিবিএ শিক্ষার্থী ও শিক্ষানবীশ সহ-কর্মী ইনান ইশরাক এবং ইউনিভার্সিটি অফ পুত্র মালয়েশিয়ায় যোগাযোগ বিষয়ে স্নাতক পড়ুয়া এফ জেড সাওনি সাওয়াস্তিকা রয়েছেন এই দলে। এই দলের অ্যাকশনেই যেনো সামনের দিনগুলোতে দেশের ই-কমার্স হবে প্রতারক মুক্ত।
শিক্ষা ও বাণিজ্যে ব্লকচেইন সল্যুশন দিয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতের সল্যুশন দিয়ে ব্লাক ও ফিনটেক সল্যুশন দিয়ে ট্রাঞ্জেকশন ট্যাঙ্গো এবারের আসরে রানার্স আপ হয়েছে। বুয়েট শিক্ষার্থী রিয়াদ আহম্মেদ অনন্ত-এর নেতৃত্বে ব্লাক দলের সদস্যরা হলেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের মো: তানভীর হাসান, মোঃ মোহাইমিনুল ও অনিন্দ্য হক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ শিক্ষার্থী স্বাক্ষর বিশ্বাস। হৃদরোগ, ডায়াবেটিসসহ অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদী রোগে অকালমৃত্যু পথযাত্রীদের পাশে থেকে স্বাস্থ্যের কালো বিড়ালের গলায় তারা পরিয়ে দিতে চান ব্লকচেইন ঘণ্টা। তাদের ব্লকচেইন-নির্ভর প্রেসক্রিপশন ব্যবস্থাপনা সিস্টেম নিশ্চিত করবে সঠিক প্রেসক্রিপশনের মাধ্যমেই কেবল ওষুধ সরবরাহ করা হবে, যা জালিয়াতি এবং অবৈধ ওষুধ ব্যবহারের সম্ভাবনা কমাবে।
অপরদিকে বৈদেশিক লেনদেনগুলোকে আরও সহজ, সুরক্ষিত এবং কম খরচে পরিচালনার ব্লকচেইন সল্যুশন ‘ফিনচেইন’ সল্যুশন দিয়ে আসরের সেকেন্ড রানার্সআপ দল ট্রানজেকশন ট্যাঙ্গো। পাঁচ সদস্যের এই দলের সদস্যরা হলেন- ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি’র শিক্ষার্থী নিয়াজ রহমান, সাদিয়া হক, তাকিয়া ফারহিন, তাহসিন ইসলাম ও আনতারা আরিফা মল্লিক। আসছে নভেম্বরে আমাস্ট্যারডামে ফের ব্লকচেইন দুনিয়ায় নিজেদের জাত চেনাতে চায় তারা। এই দলগুলোরই কোনো একটি দল বাংলাদেশের পতাকা সমুন্বত রাখবে সেই প্রত্যাশাই গোটা জাতির।





